শিরোনাম
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে গুলিতে নিহত ৬ বাংলাদেশীর দাফন সম্পন্ন ফরিদপুর পৌরসভার মেয়র কামরুজ্জামান মাজেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সেই মুন্নীর পাশে সুজানগর উপজেলা ছাত্রদলের আন্তরিক অবস্থান পাবনায় ২০৫ পিচ অবৈধ নেশাজাতীয় মাদকদ্রব্য ইয়াবা ট্যাবলেটসহ ০১ জন মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার চাটমোহরে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সরকারি গাছ কাটার অভিযোগ পাবনা ফ্রেন্ডস অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি রিয়াদ হোসেন বাবুর জন্মদিন মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় দ্বিতীয় তানভিন আহমেদ ঈশ্বরদীতে করোনা টিকার দ্বিতীয় ডোজ প্রয়োগ শুরু আটঘরিয়ায় বিআরডিবি’র নতুন ভবনের ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত ঈশ্বরদী-আটঘড়িয়ার সাবেক এমপি আব্দুল বারী সরদার আর নেই
শনিবার, ১০ এপ্রিল ২০২১, ০৫:৩৫ অপরাহ্ন

যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ভানু নেছা স্মরণে

অনলাইন ডেস্ক / ২৫ শেয়ার
প্রকাশ : বুধবার, ৩ মার্চ, ২০২১

পাবনার একমাত্র মহিলা বীর মুক্তিযোদ্ধা ভানু নেছা দীর্ঘদিন রোগ ভোগের পর ২৬ ফেব্রুয়ারি দুপুরে না ফেরার দেশে চলে গেলেন।মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০। তাকে এদিন বিকেলে গার্ড অব অনার শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে।

তিনি সাঁথিয়া উপজেলার ধোপাদহ ইউনিয়নের তেঁথুলিয়া গ্রামের মৃত আব্দুল প্রামানিকের স্ত্রী। বীর মুক্তিযোদ্ধা ভানু নেছা ২ ছেলে, ১ মেয়ের জননী।তার ২ ছেলে দিনমজুর। তিনি ২০১৩ সাল থেকেই অসুস্থ ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন রোগে ভুগে ও দারিদ্র্যতাকে বরণ করে চিরবিদায় নিলেন কিন্তু আমাদের বিবেকের কাছে অনেক অনেক প্রশ্ন রেখে গেলেন।

মিডিয়ায় জানলাম ভানু নেছাকে স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠন চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছিল। তাকে সাঁথিয়াসহ পাবনা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা করা হয়।সর্বশেষ ২০০০ সালে ষ্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে তিনি বিছানাসঙ্গি হন।আস্তে আস্তে তার গলার স্বর ও বন্ধ হয়ে যায়। তিনি আকার ইঙ্গিতে কথা বুঝাতেন।মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার অবস্থা এতই খারাপ হয় যে তাকে কোলে করে এক জায়গা থেকে অন্যত্র নিতে হতো। পত্রিকায় ভানু নেছার নাতী মনিরুল ইসলামের বক্তব্য নজরে এলো আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয় নি।সরকারিভাবে উপজেলা প্রশাসন উপজেলা হাসপাতালেই চিকিৎসা করান। তার চিকিৎসায় বড় কোন আর্থিক সহায়তা মেলেনি।

ভানু নেছা দীঘকাল ভাঙ্গা চার চালা টিনের ঘরে বসবাস করে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন।বীর মুক্তিযোদ্ধা ভানু নেছার এ মৃত্যু সংবাদ কক্সবাজারে অবস্থানকালে জানতে পারি।মহিয়সি এ বীরের মৃত্যুর খবরে মনে বিষাদের ছায়া অনুভব করলাম। চোখের সামনে ভেসে উঠলো সহজ সরল এক গ্রাম্য মহিলার অবয়ব। যিনি বাংলাদেশ বিনির্মাণে পাকিস্থানী সেনার বিরুদ্ধে জীবন বাজিতে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছেন।

ভানু নেছার সাথে আমার পরিচয় ১৯৯৬ সালে।পরিচয়ের পর থেকে তিনি মাঝে মধ্যেই তার দু:খের কথা ফোনে জানাতেন। আমি ও সাধ্যমতো তাকে পরামর্শসহ সহযোগিতার চেষ্টা চালিয়েছি। লিখতে বসে তার সাথে পরিচয় পর্বটিও মনের পর্দায় ভেসে উঠছে। সুজানগর থেকে পেশাগত দায়িত্ব পালন শেষে এক দুপুরে বাসে পাবনা ফিরছি। এ সময় খ্যাতিমান সাহিত্যিক সাংবাদিক মানবাধিকার কর্মী একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির ফোনে জানালেন মহিলা মুক্তিযোদ্ধা ভানু নেছাকে সংবর্ধণাসহ তার মাসিক সম্মানি দিতে হবে।

তিনি সাঁথিয়ায় যোগাযোগ করে তারিখ ঠিক করতে বললেন। শ্রদ্ধাভাজন শাহরিয়ার কবির ভাইকে সন্ধ্যার মধ্যে জানাবো বলে আশ^স্ত করলাম। এদিন সন্ধ্যায় ভানু নেছার সংবর্ধণার তারিখ ঠিক করে শাহরিয়ার ভাইকে জানালাম। দিনটি ছিলো যোগাযোগের দিন থেকে ৫ দিন পরের দিন। এরই মধ্যে শাহরিয়ার ভাইকে পাবনায় জনকণ্ঠের প্রতিনিধির পদ খালি হয়েছে বলে জানালাম। কিছু সময় পর শাহরিয়ার ভাই ফোন করে জানালেন দৈনিক জনকণ্ঠের উপদেষ্টা সম্পাদক তোয়াব খান ভানু নেছার এ সংবর্ধণাই আমার এ্যাসাইমেন্ট দিয়েছে।তার ফ্যাক্সে পাঠাতে হবে।

আমি সংবর্ধণার দিন সাঁথিয়ায় গিয়ে ভানু নেছার সাথে দেখা করে সাক্ষাতকার নেই। তারপর সংবর্ধণা অনুষ্ঠান ও সাক্ষাতকার সমন্বয়ে প্রতিবেদন পরিবেশন করি।আমার আজও মনে আছে সেদিন ভানু নেছাকে প্রশ্ন করেছিলাম একাত্তরের ঘাতক মতিউর রহমান নিজামীর গাড়িতে যখন বাংলাদেশের পতাকা পত পত করে উড়তে দেখেন তখন আপনার কেমন লাগে?

আমার আকস্মিক এ প্রশ্নে ভানু নেছার চোখে যেন আগুনের বহিৃশিখা জ¦লে উঠতে দেখলাম। তিনি চোখ বড় করে গর্জে উঠলেন- একাত্তরের ঘাতক মতিউর রহমান নিজামী যখন মন্ত্রী হয়ে গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়িয়ে যায় তখন ক্ষোভে দু:খে মনে হয় আত্মহত্যা করি।
অস্ত্র হাতে আবারও যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়তে ইচ্ছা হয়। একাত্তরের বাংলাদেশবিরোধী ঘাতক রাজাকার আলবদররা যখন গাড়িতে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে আগ পিছে পুলিশ পাহাড়ায় এলাকায় দাপট দেখায় তখন একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাদের অসহায়বোধের কথাও ভানু নেছা জানান। সাক্ষাতকারে সেদিন ভানু নেছা কুখ্যাত রাজাকার আলবদর নিজামীকে মন্ত্রী বানানোয় তৎকালিন বিএনপি সরকারের প্রতি তীব্র ক্ষোভ জানিয়ে বলেন-সাংবাদিক ভাই মনে রাখবেন বিএনপি আলবদর রাজাকার প্রধান নিজামীকে নিয়ে যে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে তার মাশুল একদিন তাদের কড়ায় গন্ডায় দিতে হবে।

ভানু নেছার সেদিনের চেহারার অভিব্যক্তি আজও আমি ভুলতে পারি নি। সাঁথিয়া শহিদ মিনার প্রঙ্গণে আয়োজিত ভানু নেছার সংবর্ধণার প্রতিবেদন জনকণ্ঠে পাঠালে ব্যাপক কভারেজ পায়।সে থেকে আজও জনকণ্ঠে আছি।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযোদ্ধের সময় সাঁথিয়া এলাকায় পাকবাহিনীকে প্রতিরোধ যুদ্ধে ভানু নেছা মুক্তিযোদ্ধাদের বাঙ্কারে অভিনব কায়দায় গোলা বারুদ ও খাবার পৌঁছে দিতেন। পাকবাহিনী ও এদেশীয় দালাল রাজাকারদের হাত থেকে নিজেকে ও মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ষা করতে তিনি ঝুড়ির মধ্যে গোলা বারুদ উপরে ঘাস অথবা গোবর দিয়ে ঢেকে নিতেন। সাঁথিয়া মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল লতিফের বক্তব্য নজরে এলো।

তিনি জানান নন্দনপুর পাকবাহিনীর সাথে সন্মুখ যুদ্ধে তারা বাঙ্কারে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাদের গুলি ফুরিয়ে এলে তিনি ভানু নেছাকে ডেকে এনে থানায় পাঠান গোলাবারুদ আনতে।সে গোলা বারুদ এনে দেয়।
ভানু নেছা এরপর রণাঙ্গনেই থেকে যায়।সাঁথিয়ার ধুলাউড়ি,ধোপাদহ,জোড়গাছায় জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেন।তিনি পাকবাহিনির গুলিতে আহত ও হন। তার কমান্ডার ছিলেন আব্দুল লতিফ।

ভানু নেছার জন্ম সাঁথিয়ার তলট গ্রামে ১৯৩৭ সালে।অল্প বয়সে তার বাবা মা মারা যায়। তার বাবা হলেন নলেন হলদার মাতা- রাধা রানী হলদার।এতিম ভানু নেছা পাশের গ্রাম তেঁথুলিয়ায় অবস্থান নেন। তার পওে তিনি ধর্মান্তরিত হয়ে আব্দুল প্রামানিককে বিয়ে করেন। বিয়ের কিছু দিন পরেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়।

মিডিয়াতে দেখলাম সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার এস এম জামাল আহমেদ বীর মুক্তিযোদ্ধা ভানু নেছার নামে ২৫ লাখ টাকার বাড়ি বরাদ্দের জন্য অপেক্ষমান বলে জানিয়েছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা ভানু নেছার মৃত্যুতে শোকাহত পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ্ব শামসুল হক টুকু এমপি, সাঁথিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ দেলোয়ার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার এসএম জামাল আহমেদ, পৌর মেয়র মাহবুবুল আলম বাচ্চু, সাঁথিয়া প্রেসক্লাবের সভাপতি জয়নুল আবেদীন রানা ও সম্পাদক আবুল কাশেম প্রমুখ।

লেখার শুরুতেই ভানু নেছার মৃত্যুতে আমাদের বিবেকের কাছে অনেক প্রশ্নের অবতারণার কথা উল্লেখ করেছি। এ প্রসঙ্গে কিছু না বললেই নয়। দেশের জন্য যে মহিয়সি নারী জীবন বাজি রেখে দেশ স্বাধীন করেছে তারতো এভাবে বিনা চিকিৎসায় ধুকে ধুকে মৃত্যুবরণের কথা নয়। তাকে কি উন্নত চিকিৎসা করানো যেতো না ? আজ স্বাধীনতার ৫০ বছরে ও কেন আমরা জাতীর শ্রেষ্ঠ সন্তানদের মাথা গোজার ঠাই করতে পারিনি?

কেন ভানু নেছার মতো অসীম সাহসি যোদ্ধাকে অভাব অনটনে বিনা চিকিৎসায় মরতে হচ্ছে? এ প্রশ্ন বিবেককে তাড়িত করছে। আজ প্রশাসন ভানু নেছার পরিবারকে মাথা গোঁজার ঠাই করে দেয়ার আশ্বাস দিচ্ছে। ভানু নেছারা মারা যাবার পর কেন? এর জবাব কে দিবে? আজ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ যারা শোক জানাচ্ছেন তাদের কাছে প্রশ্ন তারা কি অসুস্থ ভানু নেছার কোন খোঁজ নিয়েছেন? তারা কি পারতেন না ভানু নেছার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে? শুধু কি আপনারা এভাবেই মৃত্যুর পর শোক জানিয়ে দায় এড়াবেন?

এর দায় কার? স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক নেতারা কি দায় এড়াতে পারবেন? আমরা যেন সবাই নিজেকেই নিয়ে বেশি ব্যস্ত।আমার রাতারাতি গাড়ি চাই,বাড়ি চাই,কোটি কোটির সম্পদ চাই। কে কার খবর রাখবে ? আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সে তো রাজনৈতিক মুখের বুলিমাত্র। যা নিজের জীবনে মানবো না কিন্তু সভা সভাবেশে চিৎকার করে চেতনার কথা জানান দিয়ে বাহবা নিবো।

আর আমার মনে হয় ভানু নেছার মতো অসীম সাহসী যোদ্ধা অভাব অনটনে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণের এ লজ্জা শুধু সাঁথিয়ার প্রশাসনসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের নয়। এটা গোটা জাতির লজ্জা। মহিয়সি নারী ভানু নেছার আত্মার শান্তি কামনা করে শুধু এইটুকু বলতে চাই ক্ষমা করো হে বীর আমাদের দৈন্যতাকে ক্ষমা করো। যে দৈন্যতায় তোমাকে অবহেলা অনাদরে চিরবিদায় নিতে হয়েছে। তোমাদের যথাযথ মুল্যায়ণের এ অপারগতাকে ক্ষমা করো।

কৃষ্ণ ভৌমিক
সংবাদকর্মী, দৈনিক জনকণ্ঠ
পাবনা।


এই বিভাগের আরও খবর
ব্রেকিং নিউজ
x
ব্রেকিং নিউজ
x