‘আমাদের বিজয় দিবস’–আলাউদ্দিন আহমেদ

প্রকাশিত: ৮:২৭ পূর্বাহ্ণ , ডিসেম্বর ১৬, ২০২০

লাখো শহীদের রক্তস্নাত আমাদের বিজয় দিবস এবার উনপঞ্চাশে পড়লো। বাংলাদেশের বয়স পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই। অর্থাৎ আমরা আগামি বছর উদযাপন করবো ‘সুবর্ন জয়ন্তী’। তবে বিশ্বজুড়ে চলমান কোভিড-১৯ এর কারনে তেমনভাবে উৎসব আয়োজন হবেনা। আড়ম্বড়তা না থাকলেও কোটি বাঙালির হৃদয়জুড়ে যে আনন্দের স্পন্দন তা রুখবে কোন ভাইরাস।

স্বাধীনতার পর অনেকগুলো সরকার দেশ পরিচালনা করেছে। দেশবিরোধী চক্র হায়েনাদের দোসররা ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে দেশকে আবারো পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র করেছে। যাঁর জন্ম না হলে সম্ভব ছিলনা স্বাধীনতা আনা। যাঁর সফল নেতৃত্বে ধারাবাহিক রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম না হলে আমরা পশ্চিমাদের অন্যায়-নির্যাতন শোষন-বঞ্চনা থেকে মুক্তি পেতামনা তাকেও খুন করতে বুক কাঁপেনি ওই হায়েনাদের।

নিজ সততা. ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতা দিয়ে যিনি বিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে মাঠে-প্রান্তরে ছুটে বেরিয়েছেন সেই বঙ্গবন্ধুকে ওরা শুধু খুনই করেনি, হত্যাকারীদের নিরাপত্তা দিতে আইনও করেছিল। কি ভয়াবহ ওদের নৃশংসতা-!

পরবর্তী সময়েও দেশের মানুষ শাসিত হয়েছে সেনা, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির সরকার দ্বারা। এসব সরকারের আমলেও নানান কায়দায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি কম হয়নি। নতুন প্রজন্মের মধ্যে বিকৃত ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। স্বাধীন দেশের উপযোগী সংস্কৃতি চর্চ্চা বাধাগ্রস্ত করে বিপরীত ধারা প্রতিষ্ঠার জন্য সেই সময় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়েছে। কেন্দ্র থেকে শেকড় পর্যন্ত এই ধারাটি চলমান রাখা হয় দীর্ঘ ত্রিশ বছর। সেই অবস্থান থেকে জনগনের সমর্থনে ক্ষমতায় আসে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়া রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ।

এই দলের মতাদর্শ: বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। রাজনীতিতে অবস্থান মধ্য-বাম হিসেবে। আওয়ামীলীগ স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সরকার গঠন করে। এরপর ১৯৯৬ সালে, ২০০৮ সালে ও ২০১৪ থেকে চলমান সরকার পরিচালনা করছে আওয়ামী লীগ। দীর্ঘ এক যুগের টানা শাসনকালের এই সরকারের সফলতা-ব্যর্থতার অনেক গল্প ইচ্ছে করলেই তৈরি করা যায়। তবে অতীতের সরকারগুলোর নীতি-নৈতিকতার বিষয়টি মূল্যায়ন করলে চলমান সরকারের পক্ষে অনেক কথাই বলা সম্ভব।

বিজয় দিবসকে আমাদের বিজয় দিবস করতে জাতিরজনকের হত্যার বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার একেবারে হাল্কা করে দেখার সুযোগ নেই। এই সাহসিকতার জন্য সরকার প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ না জানালে জাতি হিসেবে আমরা অকৃতজ্ঞ থেকে যাবো।
জাতিরজনকের ভাস্কর্য নিয়ে নেতিবাচক কথা বলে যারা উগ্র ধর্মভিত্তিক রাস্ট্রের তকমা দিচ্ছে সেই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠির বিরুদ্ধে মাঠে তো আওয়ামীলীগই রয়েছে। এখানে অনেকে বলবেন, সরকার তো এক সময় হেফাজতে ইসলামের সাথে আপস করে চলেছে সুতরাং এখন তারা ডুগডুগি বাজানোর চেষ্টা তো করবেই। সুযোগ পেলে ছোবল তো মারবেই।

কিন্তু আমরা যতই সরল হিসেব করিনা কেন স্বাধীনতার অর্জনগুলো নস্যাত করতে এখনো ষড়যন্ত্রের কোন কমতি নেই। বিএনপি-জামায়াত জোটের সাথে সম্পর্ক রয়েছে অনেকগুলো মৌলবাদি রাজনৈতিক দলের। খোদ আওয়ামীলীগেও এ ধরনের চিন্তা-ভাবনার মানুষ থাকতে পারে যাদেরকে দল থেকে বলা হচ্ছে ‘অনুপ্রবেশকারি’। সুতরাং সব মিলিয়ে যিনি রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন তিনি যে মহা শান্তিতে সবকিছু করতে পারছেন তা ভাবার কোন কারন নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা তো একুশবার। বিষয়টি কি আমাদের অনুভূতিতে আঘাত করে-? নাকি আমরা শুধু নিয়েই যাবো-! বঙ্গবন্ধু সপরিবারে জীবন দিয়েছেন; কি অপরাধ ছিল তাঁর-? বিবেকের কাছে প্রশ্ন করে দেখেন সেখানে অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখবেননা। আসলে জাতি হিসেবে আমরা অকৃতজ্ঞই থেকে গেলাম। বিজয়কে আমরা ‘আমাদের বিজয় দিবস’ ভাবতে শিখলামনা।

চলমান দুর্নীতি বিরোধী অভিযান তেমন জোরালো না হলেও যেটুকু করা সম্ভব হচ্ছে তাতেও দুর্নীতিবাজদের কিছুটা কাঁপন সৃষ্টি হয়েছে বলা যায়। এই অভিযানকে মাঠ পর্যায়ে বিস্তৃত করতে জনমত রয়েছে জোরালো। যেকোন মূল্যে এটা করতে হবে। তা নাহলে বিজয় দিবস আমাদের হবেনা।
কারা করেছে বিদেশে অর্থপাচার। কোন কোন দেশে কারা সেকেন্ড-হোম বানিয়েছে এসব খোঁজখবর পাওয়া সরকারের জন্য কঠিন কিছু নয়। বিদেশে আমাদের দুতাবাসগুলো কি কাজ করে-? রাষ্ট্রের সম্পদ বিদেশে পাচার হচ্ছে এটা দেখা কি তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়েনা-?।
রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর যেকোন কিছু সম্পর্কে সরকারের নজরে আনা সকল নাগরিকের কর্তব্য। আর তারা তো সরকারের বেতনভোগী। পাচারকারীদের সমপরিমান অর্থ দেশে রাখা তাদের সম্পদ থেকে রাষ্ট্রের অনুকূলে নেয়া শুরু হলে এমনিতেই দুর্নীতি কমে যাবে। দুর্নীতির সম্পদ যদি নিরাপদে ভোগ করা না যায় তাহলে তা আহরণের ঝুঁকি কেবল আহাম্মকরাই নিতে পারে। সংগৃহিত এই সম্পদ দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কাজে লাগালে দেশের লাখো বেকারের আয়-রোজগারের ব্যবস্থা হতে পারে। এভাবে করতে পারলেই তো ‘বিজয় দিবস আমাদের’ হতে পারে।

 

লেখক: সিনিয়র সংবাদকর্মী ও সাবেক সভাপতি-ঈশ্বরদী প্রেসকাব)। 

E-mail: alauddin.janodabi@gmail.com

Mobile: 01711-317938