দীর্ঘ বন্যায় চলনবিলে মাছের উৎপাদন বেড়েছে দেড়গুণ!

প্রকাশিত: ৫:০০ অপরাহ্ণ , নভেম্বর ১৯, ২০২০
ছবি-সংগৃহীত

শফিউল আযম:  এবারের দীর্ঘ বন্যায় দেশের বৃহত্তম মিঠা পানির মাছের উৎস চলনবিলে মাছের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। জেলেদের জালে বিভিন্ন প্রজাতির প্রচুর মাছ ধরা পড়ছে। স্থানীয় বাজারে বেশ কম দামে বিক্রি হচ্ছে মাছ। এতে ক্রেতারা খুশি হলেও সুবিধা করতে পারছেন না মৎস্যজীবীরা।

খড়া জালে প্রতি ৩-৫ মিনিট পর ২-৩ কেজি ছোট-বড় মাছ উঠে আসছে। আর কারেন্ট জালে ছোট মাছ পরিমাণে বেশি আটকা পড়ায় জাল বাড়িতে এনে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মাছ ছাড়াতে হচ্ছে।

জানা যায়, চলনবিল অঞ্চলে মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কিংবা বিপণনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা নেই। এ কারণে জেলেরা পানির দামে মাছ বিক্রি করতে বাধ্য হন। বিলের মাছকে কেন্দ্র করে তারাশের মহিষলুটি ও নাটোরের সিংড়ায় মাছের আড়ত গড়ে উঠেছে। কিন্তু দালালদের কারণে জেলেরা মাছের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ অঞ্চলে মাছ সংরক্ষণের জন্য হিমাগার না থাকায় মৎস্যচাষিরা লাভের মুখ দেখা ভার।

মৎস্যভাণ্ডার খ্যাত এ অঞ্চলের বিভিন্ন পয়েন্টে ফিশ ল্যান্ডিং সেন্টার, ফিশ কোল্ডস্টোরেজ এবং বরফ উৎপাদন কারখানা তৈরি করলে প্রক্রিয়াজাত করে মাছ বিদেশে রফতানি করা সম্ভব হতো। এতে দেশ অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হতো।

নাটোর মৎস্য বিভাগ জানায়, ১৬টি নদী, ২২টি খাড়ি ও ৩৯টি বিলের সমন্বয়ে গঠিত দেশের বৃহত্তম মিঠাপানির দেশী প্রজাতির মাছের উৎস চলনবিল। এক সময় এই বিল হতে প্রায় ৮০ প্রজাতির দেশী মাছের জোগান পাওয়া যেত। যদিও কালের বিবর্তনে অনেক প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তারপরও সবচেয়ে বেশি প্রজাতির দেশী মাছ উৎপাদনের মূল উৎস চলনবিল।

দেশী মাছের মধ্যে রুই, লওলা, কালবাউশ, মৃগেল, কাতল, চিতল, আইর, বোয়াল, পুঁটি, টেংরা, বায়েম, খলসে, গুচিবাইম, সরপুঁটি, বেলেসহ প্রায় ৬০ প্রজাতির মাছ জেলেদের জালে ধরা পড়ছে।

চলনবিলের চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, তাড়াশ, সিংড়া, গুড়দাসপুর, এলাকায় সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি এলাকাতে মাছ ধরতে ব্যস্ত জেলে ও মৌসুমি মাছশিকারিরা। বিশাল চলনবিলে শুধু জাল ফেলেই নয়; বাঁশের বানা দিয়ে, খড় দিয়ে এবং নানা প্রকারের জাল নিয়ে জেলেদের পাশাপাশি, কর্মহীন অনেক মানুষ চলনবিলে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

চলনবিলের তাড়াশ উপজেলার মাকোড়শন গ্রামের মৎস্যজীবী আসালত হোসেন বলেন, ‘প্রতি বছর অক্টোবর-নভেম্বরে চলনবিলের মাছ প্রায় শেষ হয়ে যায়, কিন্তু এ বছরের চিত্র ভিন্ন। জাল ফেললেই মিলছে মাছ। প্রতি বছর এ সময় তিন থেকে চার ঘণ্টা জাল ফেলে ১০ থেকে ১২ কেজি মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু এবার একই সময়ে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কেজি মাছ ধরতে পারছি।

সিংড়ার বিয়াশ গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, আমি কয়েক বছর ধরে চলনবিলের দেশী মাছের ব্যবসা করছি। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার মাছের পরিমাণ বেশি তবে মাছের দাম অনেক কম।

চলনবিলের দেশী মাছের সবচেয়ে বড় আড়ত মহিষলুটি মাছের আড়ত। প্রতিদিন এ আড়তে ভোর থেকে চলনবিলের বিভিন্ন এলাকা থেকে মাছ নিয়ে আসেন জেলেরা। এই মাছের আড়তে বেচাকেনা চলে সকাল ৮টা পর্যন্ত ।

চলনবিল এলাকায় খড়াজাল, মইয়াজাল, ধর্মজাল, ঝাঁকি জাল, বাদাই জাল ও কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ শিকার করছেন জেলে ও শৌখিন মাছ শিকারিরা।

বৃহস্পতিবার সকালে তাড়াশ পৌর শহরের মাছ বাজারে প্রতি কেজি পুঁটি ও চাটা খইলসা ৪০ টাকা, ছোট ছোট বোয়াল, কৈ, মাগুর, জিয়াল, ট্যাংরা, গুচিবাইম ২০০ থেকে ২৫০ টাকা, আর রুই, কাতলা, মৃগেলের দাম ওজনভেদে ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। এই মাছ চাতাল মালিকরা কিনে শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করছেন। এই শুঁটকি মাছ নীফামারী, রংপুর, নাটোর বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বাজারজাত করা হচ্ছে।
তাড়াশের মৎস্যজীবী আব্দুল করিম, রেজাউর রহমান, আজাদ হোসেন বলেন, চলনবিলের মূল অংশে এখনো বেশ পানি রয়ে গেছে। তবে উঁচু অঞ্চলে কোথাও কোমর পানি আবার কোথাও হাঁটুপানি। কম পানিতে প্রচুর পরিমাণে দেশীয় প্রজাতির মাছ ধরা পড়ছে। তারা আরো বলেন, খড়া জালে প্রতি ৩-৫ মিনিট পর ২-৩ কেজি ছোট-বড় মাছ উঠে আসছে। আর কারেন্ট জালে ছোট মাছ পরিমাণে বেশি আটকা পড়ায় জাল বাড়িতে এনে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মাছ ছাড়াতে হচ্ছে।

সিংড়া পৌর মাছবাজারের আড়তদার নুরনবী প্রামাণিক বলেন, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বাজারে প্রচুর দেশী মাছ পাওয়া যায়। প্রতিদিন ঢাকা, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, বগুড়া, নাটোর থেকে ব্যবসায়ী এসে সিংড়া পৌরবাজার ও তাড়াশের মহিষলুটি বাজার থেকে মাছ কিনে নিয়ে যান।
সিরাজগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শাহেদ আলী বলেন, এবারের প্রলম্বিত বন্যায় চলনবিলের নদী, খাড়ি ও বিলের বিশাল এলাকা প্রায় সাত মাস পানিতে নিমজ্জিত আছে। দীর্ঘ সময় চলনবিলে পানিপ্রবাহ থাকায় দেশী মাছের প্রজননের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হয়। এতে মাছের ডিম উৎপাদন ও ডিম থেকে মাছ উৎপাদনের সময় চলনবিল জলমগ্ন থাকায় মাছের উৎপাদন প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।