একটি ধারণা পত্র: একজন শিক্ষার্থী একটি সমন্বতি কৃষি খামার

প্রকাশিত: ৮:৫৭ অপরাহ্ণ , অক্টোবর ১৮, ২০২০

“একজন শিক্ষার্থী একটি খামার” হলো একটি স্বপ্ন যা দেশের জনগণের জীবনমানের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে গ্রাম ও শহরে বসবাসরত সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় কৃষিকাজকে (খাদ্যশস্য, পশু-পাখিপালন, মৎসচায় ও বনায়ন) জনপ্রিয় করা। আর এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে প্রধানত স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে। মূলতঃ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের উদ্যোগে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কতৃপক্ষকে নির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমেই যেখানে প্রত্যেক শিক্ষার্থী তাদের নিজ নিজ বাড়ির আঙ্গিনায় বাগান তৈরি করবে। দ্বিতীয়ত যে সব পরিবারে কোন শক্ষার্থী নেই সেই সব পরিবারের কাছে সরকারের এই নির্দেশনা বাস্তবায়িত হবে ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের নিবিড় তত্বাবধানে। তৃতীয়ত এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের সাহায্যে কমিটি গঠনের মাধ্যমে দেশের প্রতিটি প্রান্তে পৌছে দেয়া সম্ভব। এ বিষয়ে আমরা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকরি সংস্থা যারা দেশের তৃণমূল পর্যায়ের জনগোষ্ঠির মধ্যে কাজ করে তাদেরও সাহায্য নিতে পারি। আর শিক্ষার্থীরা এই বাগানের সব কিছু উৎপাদন করবে “জৈবিক কৃষিপদ্ধতি” ব্যবহারের মাধ্যমে যা “সবুজ কৃষি” নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কোন ক্ষতিকর রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার না করে বিভিন্ন ধরনের শাক-সব্জি উৎপাদন করবে।

এই প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এতে সরকারের কাছে বাজেট প্রণয়নের কোন প্রস্তাবনা দেওয়া হবেনা। দায়িত্ব প্রাপ্ত সংস্থার স্থানীয় উৎসই এখানে কাজে লাগানো হবে। কিন্তু শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর আদেশ ও নির্দেশনায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং বিভাগের নিবিড় তত্বাবধানে ঘোষিত বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। এতে করে খুবই কম খরচে শুধুমাত্র বীজ ও অল্প পরিমান সার ব্যবহারের মাধ্যমে এই প্রকল্পের অংশীদারেরা তাজা, স্বাস্থ্যকর এবং ভেজাল মুক্ত সুষম খাদ্য পাবেন। এছাড়াও চাষকৃত উদ্ভিদগুলো বর্তমান সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর দিক থেকেও পরিবেশকে রক্ষা করবে।

এই প্রকল্পের মাধ্যমে সকল শিক্ষার্থীদেরকে বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি যেমন, লালশাক, পুঁইশাক, ডাটাশাক, ধনেপাতা, বেগুন, মরিচ, লাউ, চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, চিচিঙ্গা, করোলা, শসা ইত্যাদি জন্মাতে উৎসাহিত করা হবে। এর বাইরে চারা রোপন ও ফসল উৎপাদনের মধ্যবর্তী সময়ে তারা ক্ষুদ্র পরিসরে হাস-মুরগী, গরু-ছাগল এমনকি মাছ ছাষও করতে পারবে। পাশাপাশি পরিবারগুলো উদ্যানচাষ, বনপালন এবং ঔষধি গাছ ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের ফলের গাছ যেমন, পেঁপে, পেয়ারা, লেবু, তাল, বেল, কামরাঙ্গা, সজিনা, নিম, বাতাবি লেবু, কাঠাল, আম এবং বিভিন্ন ধরনের কাঠ উৎপাদনকারী গাছ তাদের আঙ্গিনায় বা বাড়ির পাশে লাগাতে পারবে। এ কাজ করতে শিক্ষার্থীরা তাদের পরিবারের সদস্যদের বিশেষতঃ বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে এবং এর পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ইন্টারনেট ব্যবহার করেও কৃষিকাজের কৌশলগুলো শিখে নিতে পারে। সরকারের নির্দেশনায় কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, কৃষি গবেষনা সংস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলো ও তাদেরকে কৃষি কাজে নানা ধরনের পরামর্শেও পাশাপাশি সহায়তাও করবে।

এই কর্মসূচী গ্রহনের মাধ্যমে শহর ও গ্রামাঞ্চলের পরিবারগুলোর বড় একটি অংশ উপকৃত হবে। আমরা দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি এই কর্মসূচী গ্রহণ অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দৃষ্টিকোন থেকে যথেষ্ট লাভজনক বলে প্রমানিত হবে। এই কর্মসূচীর আওতায় আনা পরিবারগুলো তাজা ও ভেজাল মুক্ত শাক-সবজি গ্রহনের মাধ্যমে সুস্থ্য ও সুন্দর জীবন যাপনের পাশাপশি তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারবে যা বর্তমান “করোনা” পরিস্থিতিতে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। প্রকল্পের সুবিধাভোগীরা তাদের বন্ধু-বান্ধব, পাড়া প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনদের সাথে উৎপাদিত শাকসবজি বিনিয়ম করতে পাববে। অতিরিক্ত উৎপাদিত পন্য বাজারে বিক্রির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাত খরচ হিসাবেও দেয়া যেতে পারে। সাধারন মানুষের মধ্যে ভেজালমুক্ত খাদ্য সরবরাহে এটি সহায়তা করবে। প্রকল্পে অংশগ্রহনকারী রা ডিম, মাছ, মাংস, ফলমূল ও শাক সবজি গ্রহনের দ্বারা তাদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন, খনিজ ও ভিটামিনের অভাব পূরণ করতে পারবে। তাদের লাগানো বিভিন্ন ধরনের ফলের গাছ শুধু ভেজালমুক্ত ও সুস্বাদু ফলই দেবে না বরং তাদেরকে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দূর্যোগের হাত থেকেও রক্ষা করবে। এ কর্মসূচীর বাগান পরিচর্যা, পশুপালন, মাছচাষ ইত্যাদিতে অংশগ্রহনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেও মনমানসিকতা সজিব হবে এবং তারা একটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে উঠবে। এছাড়াও এ ধরনের কর্মকান্ডে ব্যস্ত থাকার ফলে শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোনের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার থেকে দূরে রাখা সম্ভব হবে।

শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরণের বৃক্ষ রোপনের জন্য খাস জমি, রাস্তা ও রেলপথের পাশে, চরের জমি, বেড়িবাঁধ ইত্যাদি ব্যবহার করতে পারে। আর এ জন্য স্থানীয় বন বিভাগ কর্তৃক তাদেরকে বিনা মূল্যে গাছের চাড়া বিতরণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নগর এবং শহর অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা তাদের বাড়ির কাছাকাছি খালি জমি ব্যবহার করতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন হলো তারা জমি না পেলে তাদের বাড়ির ছাদও বাগান করার বা ছোট ছোট ফলের গাছ লাগানোর কাজে ব্যবহার করতে পারবে। তারা তাদের বাড়ির বারান্দায় বিভিন্ন অব্যবহৃত পাত্র যেমন, ব্যবহৃত তেলের কন্টেইনারে বিভিন্ন ধরনের লতা বা লতা জাতীয় গাছ যেমন, করোলা, শসা, মরিচসহ বিভিন্ন ধরনের শাক সবজি উৎপাদন করতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গনের অব্যবহৃত খালি জমিতে শিক্ষার্থীদের দ্বারা বিভিন্ন মৌসুমি এবং অঞ্চল উপযোগী শাকসবজি উৎপাদন করানো যেতে পারে। প্রস্তাবিত কর্মসূচীর মাধ্যমে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা ‘ভার্মিকম্পোস্ট প্রযুক্তি’ এবং জৈব সারসহ কৃষি ক্ষেত্রে নতুন নতুন গবেষনার মাধ্যমে উৎপাদিত প্রযুক্তির সাথে নিজেদের পরিচিত করতে পারবে।

এই লিখাটি কেবলই একটি ধারনামাত্র। আমরা এই ধারনাকে একটি পূর্ণাংগ প্রস্তাবনা হিসেবে প্রস্তুতির জন্য সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, মন্ত্রণালয়, শিক্ষাবিদ, কৃষিবিদ, গবেষক, পরিকল্পনাবিদ, নাগরিক সমিতি এবং অন্যান্য সংস্থা ও ব্যক্তি বর্গের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ ও মতামত চাইছি।

প্রফেসর ড. মো. আমিন উদ্দিন মৃধা
(কৃষিবিদ এবং গবেষক)